হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রতিটি যুদ্ধের পুলসিরাত পার হতে তার কাজে পদক্ষেপে চিন্তা-মননে-পারঙ্গমতায় মোজেজা প্রদর্শনের আভাস পাই। তার যথার্থ সদুত্তরও আছে। অতুলনীয় গুণের ব্যঞ্জনায় তিনি ছিলেন সব সৃষ্টির লক্ষ্য-মূল-সূত্রপাত ও কেন্দ্রবিন্দু। তার জীবন পর্যালোচনা করলে মন ভরে ওঠে যেমন বর্ষায় পদ্মার দুই তীর ভরে ওঠে। কেননা লওহ-কলম-আরশ-কুর্শি থেকে শুরু করে ফেরেশতা-জিন-মানুষ-পশুপাখি-বৃক্ষলতা-জলবায়ু-অণু পরমাণু তথা তাবৎ সৃষ্টি ও জগৎ সেবার জন্য তিনি যে রহমত পরম কল্যাণের। তাই শক্তির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে আনীত কুরআন বর্ণিত হাদিসের পালিত সুন্নাহ সবই মোজেজাপূর্ণ।
খাদেমুল আম্বিয়া ও সাইয়্যেদুল মুরসালিন এবং সারোয়ারে কায়েনাত হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা:-এর মোজেজা ও অন্যান্য নবী-রাসূলের মোজেজার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। অন্যান্য আম্বিয়া কেরামের ক্যারিসম্যাটিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বিশেষ বস্তু অঙ্গে। যেমন হজরত মুসা আ:-এর মোজেজা তার লাঠি ও হাতে। হজরত ঈসা আ:-এর মোজেজা তার ফুঁ বা দমে। কিন্তু হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর মোজেজা তার পুরো জীবন-প্রাণেই ব্যাপকভাবে দেয়া। তাঁর সারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও যেমন মোজেজা ছিল তেমনি তার কোনো ইচ্ছাতেও তা বহাল ছিল।

হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবনে অলৌকিকতায় পূর্ণ প্রচুর ঘটনার মহাসমাবেশ দেখতে পাই। যার বিবরণ লিখে শেষ করা যায় না। খোদ কুরআন শরিফ নবীজীর এসব মোজেজার সাক্ষ্য বহন করে। পরার্থপরতার অন্তর্জাত তাড়না থেকে নবীজীর নাফস বা প্রাণ কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা দৈহিক কোনো বস্তু ছাড়াও এমনকি তার ইশারা-ইঙ্গিতেও মোজেজা প্রদর্শনের ক্ষমতা ছিল। যেমন হুজুরের অঙ্গুলি হেলনে আজ্ঞাবহ চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। হিজরতের রাতে হুজুরের বাড়ি ঘেরাওকারী মক্কার দুর্বৃত্ত-সন্ত্রাসী-খুনি সর্দারকে লক্ষ্য করে ধুলাবালিতেই ওরা সজাগ-সচেতন ও চোখ খোলা থেকেও নবীজীর স’ানকে দেখতে পেত না।
এভাবেই ভালোবাসার পয়গম্বর শক্তিশালী দুর্গ বিজয়ের আগের রাতে ঘোষণা দিলেন, আগামীকাল যাকে সেনাপতি করে পাঠাবেন তিনিই বিজয়ী হবেন। কয়েক দিন যুদ্ধাভিযানে সবাই ক্লান্ত হলেও পরের দিনের ভাগ্যবান সেনাপতি কে হবেন সে চিন্তায় সাহাবিদের চোখে রাতে ঘুম আসেনি। উৎকণ্ঠার চিহ্নগুলো এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। ভোর বেলায় নবীজী ডেকে পাঠালেন হজরত আলী (রা:)-কে। তিনি যখন এলেন তখন চোখ মেলতে পারছিলেন না। সারা রাত চোখের ব্যথায় অস্থির ছিলেন। নবীজী তাকেই সেনাপতি হওয়ার জন্য ঘোষণা দিলেন। চটজলদি আলী (রা:) রাজি হলেন। কিন্তু ঘুম ঘুম ভাব যে তাঁর কিছুতেই কাটছে না। নবীজী ওই চোখে নিজের পবিত্র থুতু ছিটিয়ে দিতেই তৎক্ষণাৎ তা ভালো হয়ে গেল।
তা যা বলছিলাম, আর একবার নবীজীর শরীরের রক্ত পান করেও আর এক সাহাবি দোজখের দরোজা বন্ধ করে দিলেন। সিঙ্গায় টেনে আনা বাহ্যত দূষিত রক্তেরই এ অলৌকিকতা।

হুজুরের এহেন কর্মযজ্ঞ শুধু নবুয়ত প্রাপ্তকালীন সময় থেকে নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। এর জন্য তাকে বহু রৈখিক দৌড়ঝাপ করতে হতো না। এমনকি মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ও তিনি নানা কারিশমা দেখিয়েছেন মা আমিনাকে।
রাসূল (সা:)-এর প্রতি প্রাকৃত বা পরাপ্রাকৃতিক ক্ষমতা সীমিত আকারে অন্যান্য নবী-রাসূলদেরও দেয়া হয়। তারা অলৌকিক ক্ষমতা বলে কিস্তিমাত করতেন তাদের নবুয়ত ও রেসালাতের প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে। কেননা মোজেজা অনুসারীদের গাঁটছড়া বাঁধতে ও বিরোধীদের গতিপ্রবাহ কমাতে এটা দরকার ছিল। তাই প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে আল্লাহতায়ালা এ বিশেষ বিশাল ভাবমর্যাদা দিয়ে অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেন।
লেখক : প্রবন্ধকার

Comments